পোড়া রুটি

0
7

আমিনুর রহমান

মাঠে ইরি ধান কিছু কিছু থোড় বা কাচথোড়, আবার কিছু গাছে শিষ বের হয়ে ফুল এসেছেে এমন সময় তখন আমাদের গ্রামের প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই খাদ্য সংকট দেখা যেত। ঘরের চাল প্রায় শেষ। এসময় ক্ষেতের গম আবার পেকে যেত।গম আগে উঠাতে আমাদের বাড়িতে শুধু রাতে ভাত রান্না হতো আর সকাল-দুপুর গমের রুটি খাওয়া হতো।এভাবে একমাসের মধ্যেই ইরি ধান ঘরে চলে আসতো।ছোটবেলায় গমের রুটি আমার ভীষণ অপছন্দ ছিল। স্কুল থেকে টিফিন পিরিয়ডে বাড়ি আসতাম খেতে।যখন দেখতাম মা রুটি বানিয়েছে; খুব রাগ হত।তবে পাপড়ের মত মচমচে করে পোড়ানো রুটি আমি খুব পছন্দ করতাম।তাই মা রুটি বানানোর শেষের দিকে দুই তিনটি রুটি মচমচে করে পুড়িয়ে রাখতেন আমার জন্য।আমি স্কুল থেকে আসলে মা হেঁসেল ঘরে গিয়ে পোড়া রুটি এনে দিতেন। আমি একটি পিঁড়ির উপর বসে খেতাম আর একটি খেতে খেতে স্কুলের দিকে যেতাম।আমার রুটি খাওয়া দেখলে মায়ের কান্না আসবেই। আমারও তখন বুক ফেটে কান্না আসতো।আমি কাদো কাদো হয়ে বলতাম- কি হলো মা চুপ করবে! মা আমার চোখের জল আঁচল দিয়ে মুছে দিয়ে বলতেন- লক্ষী বাবু, খা খা। কাঁদছি না। কই কাঁদছি? মায়ের স্নেহের স্পর্শ, গা থেকে শাড়ী উপচিয়ে আসা শীতল মিষ্টি গন্ধ পৃথিবীর কোন গন্ধের সাথে মেলেনি আজো।আমার পোড়া রুটি খাওয়া দেখলে মা কেন কাঁদতেন তা আমার বা পরিবারের কারো অজানা না।
তখন আমাদের প্রায় পঁচিশটি ছাগল ছিল। দিগন্ত মাঠে গ্রামের বিভিন্ন বয়সের মানুষেরা ছাগল-গরু ছেড়ে দিয়ে ডাংগুলি, মারবেল আবার কখনো স্যালো মেশিনের ছোট্ট চালাঘরে জামাল-জরিনার কিচ্চা, নসিমনের যাত্রা,রহিম-রুপবান, গাজী-কালূর গান ইত্যাদির আসর বসাতো। ভাই আবার রাতে শুয়ে আমাদের সেগুলো শুনাতেেন আর প্রতিদিন কীসব আনন্দ করে তা বলে একেবারে লোভ ধরিয়ে তুলতেন।তাই ছুটির দিনে ভায়ের সাথে মাঠে যাওয়ার লোভ ছিল খুব প্রবল।
সেদিন শুক্রবার।স্কুল ছুটি থাকায় আমি মাঠে গেছি বড় ভায়ের সাথে ছাগল চরাতে। মা বলেছিল আসার সময় কিছু কলমিশাক তুলে আনিস বিল থেকে।আমি মাঠে য়াওয়ার একটু পরপরই প্রচন্ড বৃষ্টি।আষাঢ় মাসের শুরুর দিক। ছাগল -গরু সব দৌড়ে বাড়ীর দিকে সাথে সাথে আমরাও।আমার হাতে কিছু কলমির শাক।একেবারে কাকভেজা হয়ে দৌড়ে হেসেল ঘরে উঠে দেখি মা কিছু চাল,গম ও ছোলা ভেজে কুলোর উপর ঠান্ডা করতে রেখে রুটি সেকছে।আমি কলমিশাক রেখে একমুঠো পুরে খেতে লাগলাম। মা বললেন- জ্বর আসবেে।আগে গোছল করে গা ‍মুছে আয়।তারপর খাবি।আর তোর জন্য পোড়া রুটি সেকে রাখছি।আমি আর দেরি না করে পুকুরে গেলাম গোছল করতে। তখনও আমি ঠিকমত সাঁতার শিখিনি।গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। আমি কোমর পানিতে নেমে গোছল করছি। পুকুরে সোহেল,রিন্টু,মস্তক এরাও গোছল করছে। ডুব খেলা করছে। হঠাৎ ঢেউ এসে আমি তলিয়ে গেছি কেউ দেখেনি।আমার তারপর আর কিছুই মনে নেই।পরেরগুলো আমার শোনা কথা । ডোবার পরপরই পাশের বাড়ির নজরুল কাকা গোছল করতে নামলে আমি নাকি তাঁর পায়ে বাধি। সে চমকে ওঠে। পরক্ষণে সাহস করে ডুব দিয়ে তুলে দেখে আমি। নজরুল কাকার চিৎকারে সবাই জড়ো হয় পুকুর পাড়ে। আমার মা এসেে আমাকে দেখেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। সবাই বলেছিল নাকি আমি আর বেঁঁচে নেই। কিন্তু আমার বাবা বুকে চাপ দিয়ে পানি বের করছেন।মাথার উপরে তুলে ঘুরাচ্ছেন। মকবুলের মা বাবাকে থামাতে চেষ্টা করছে আর বলছে- ওগো বিটা,ওকে বারান্দায় শোয়াও। আর ঘুরিও না।যার মাল সে নিয়ে গেছে।এই ছিল তোর কপালে! আহা!
মায়ের নাকি জ্ঞান ফিরে আসে আর মা বলে -ওরে বাবু, আমি তোর জন্য রুটি পুড়িয়ে রেখেছি! কে খাবে রে বাবা !বলে আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
আমার বাবা নাকি কারো কথা শুনেন নি, তাঁর মাথার সাথে আমার পেট চেপে ধরে ঘুরাচ্ছেন। হঠাৎ গোঙানোর শব্দ করে টানা শ্বাস ফেলি আমি।উপস্থিত সবাই তখন চিৎকার করে বলে বেঁচে আরে রে..

আমার রাতে হুশ ফেরে। চোখ পড়ে পাশে জ্বালানো হারিকেনের আলোর দিকে।তারপর মায়ের দিকে। মা পাথায় পানি পট্টি দিচ্ছে।গা ভর্তি জ্বর।পাশে বাবাও বসে।ফজলু ডাক্তার টেলিস্কোপ দিয়ে বুকের কী সব পরীক্ষা করছেন।ঐ পাড়া থেকে অহেদের বোন সুকজান আমাকে দেখতে এসছে। সে ভিক্ষা করে বেড়ায়। আমাকে খুব আদর করতো্। দেখা পেলেই থুতনিতে হাত দিয়ে আদর করে নিজের হাতে চুমু খেত।বাবাকে সুকজান বললো- শোন, তিনটে ডাব ও তিনটে পান পড়ে দিবানে বাবুর হাত দিয়ে ফেলে দিও পুকুরে।আর কয়েকদিন যেন কেউ না নামে। পুকুরে জিনের ভর আছে।
মা হঠাৎ আমার হাতে দিল সেই পোড়া রুটি। আমি ছোট ছোট কামড়ে খাচ্ছি রুটি। আর মা ঠুকরে কেদে ফেলে বলছে -এই রুটি থুয়ে তুই কেন চলে যাচ্ছিলি রে বাবু…. বাবার ধমকে মা আবার চুপ! আমারও চোখে জল ছলছল করছিল তখন । রুটি চিবায় আর এক দৃষ্টিতে পাশে জ্বলা হারিকেনের আলোর দিকে চেয়ে থাকি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here