ডেঙ্গু অপেক্ষা ভাইরাল জ্বরে আক্রান্ত সারাদেশ :

0
8

আমিনুর রহমান

ডেঙ্গু এক ধরণের ভাইরাসজনিত জ্বর। এডিস মশার মাধ্যমে এ রোগ ঢাকাসহ সারাদেশে ছড়িয়েছে। এবং বর্তমানে এটি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরেও চলে গেছে। তাই জাতীয় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে ডেঙ্গু মশা। কিন্তু এর চেয়ে একটি ভাইরাস অনেক আগেই মহামারী হয়ে রয়েছে তা হলো ভাইরাল হওয়ার ভাইরাস।আজকাল যে কেউ ভাইরাল হতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এবং নানা ধরণের কাজের মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে রাতারাতি পরিচিতি পাবার নেশায় উঠে পড়ে লেগেছে। যে কাজগুলো করে তারা ভাইরাল হতে চেষ্টা করছে তার বেশিরভাগই অকাজ। নিম্ন শ্রেণি থেকে শুরু করে সমাজের উঁচু স্তরের মানুষের মধ্যেও আজ ভাইরাল হওয়ার নেশা চরম মাত্রায় কাজ করছে।


ভাইরাল শব্দটি এসেছে ভাইরাস শব্দ থেকে। যার আভিধানিক অর্থ ভাইরাসজনিত বা ভাইরাসঘটিত। আর এর ব্যবহারিক অর্থ বিষপুর্ণ,দুষিত,বিষাক্ত,দুষ্ট।কিন্তু মিডিয়ার ক্ষেত্রে এ শব্দটি যে অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে তা একেবারে আলাদা।এ ক্ষেত্রে এর সেরা অর্থ ধরা হচ্ছে মনোযোগী, স্বাভাবিক, সক্রিয়, সৃ বা আধুনিক।


তবে ভাইরাল শব্দটি যেহেতু ভাইরাস থেকে উৎপত্তি আর ব্যবহারিক অর্থ থেকে পরিষ্কার যে, এটি নেগেটিভ অর্থেই ব্যবহার করা হয়। যদিও ভাইরাসের কিছু উপকারী দিক রয়েছে কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভাইরাস মানব শরীর এমনকি বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণিদেহে মারাত্মক ক্ষতি করে। তাই ভাইরাল হওয়ার মধ্যে কোন বিশেষ কৃতিত্ব থাকার কথা নয়। যদিও বর্তমান যুগে ভাইরাল শব্দটি স্যোসাল মিডিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলা বা ভালো কিছু বোঝানো হচ্ছে। কিন্তু এটা সুশীল সমাজের কাছে বা কোন কোন ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কাছেও এটি চরম অস্বস্তিকর বলে মনে হচ্ছে।


আজকাল ফেসবুক বা ইন্টানেটের যুগে ভাইরাল হচ্ছে না এমন কোন বিষয় নেই। নানা ধরণের সামাজিক কুসংস্কার, ধর্ম-কর্ম থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সব্বোর্চ স্তরে নানা বিষয় ভাইরাল করে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। আর একটি মহল রাতারাতি দেশের মানুষের কাছে পরিচিত হবার মাধ্যম হিসাবে বেছে নিয়েছে এই ভাইরাল হওয়া।মাঝে মাঝে দেখা যায় কবর থেকে লাশ ওঠা, করবস্থানে ময়না পাখি আল্লাহ জিকির করছে আবার রাতের বেলায় ভুত হেটে বেড়াচ্ছে, বিভিন্ন ভন্ড ফকিরের ভন্ডামী ইত্যাদি।আবার ওয়াজ-নসিহত করে এক প্রকার ধুর্ত আলেম সমাজ ভাইরাল হয়ে দ্রুত পেয়ে যাচ্ছে পরিচিতি, জমছে তাদের টি আর পি বা ওয়াজ ব্যবসা।আবার সেই ওয়াজ কাটিং করে একটি মহল বানাচ্ছে টিকটক নামে ভিডিও। সেটিও ব্যাপকভাবে স্যেসাল মিডিয়ায় ভাইরাল হচ্ছে। শুধু তাই নয়, নিজের রুমে বসে বিভিন্ন ধরণের গান করে সেগুলো ফেসবুক বা নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে ছেড়ে রাতারাতি স্টার বনে গেছে কিছু শিল্পী যাদের স্ট্রেজ শো বা রিয়েলিটি শোর ডিমান্ড নাকি তিন খেতে চার লক্ষ টাকা। অথচ আদৌ তারা শিল্পী হওয়ার যোগ্য বা গান গাওয়া তো দূরে থাক শিল্প সাধনা কি; সে বিষয়ে ন্যুনতম জ্ঞান আছে কিনা সন্দেহ। এরই মধ্যে এভাবে ভাইরাল হয়েছে কয়েকজন শিল্পীর গান।তাদের গালগল্পও ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে মিডিয়াতে। এসব শুনে মনে হচ্ছে এরাই এদেশের সেরা শিল্পী। এখন তো গল্লি বয় রানা নিয়ে দেশ বিদেশের গণমাধ্যম তোলপাড়।টিকটক ভিডিও তরুণ প্রজন্ম খুব খাচ্ছে বলে এদের মধ্যেই চলছে এসব কুরুচিপূর্ণ জিনিস করার প্রবণতা।বিভিন্ন ফানি নাটকের কাট করে সেখানে নানা ঘটনার সাথে মিল রেখে ডাইলগ দিয়ে মানুষকে বিনোদন দেওয়ার নামে ক্ষতি করছে, বিকৃত মস্তিষ্কের তৈরি করছে তরুণদের।ভাদাইম্যার পোলার মতো অসংখ্য কুরুচিকর ভিডিও আপলোড করে তরুণদেরকে বিকৃত মানসিকতার করে ফেলা হচ্ছে। হিরো আলম তো বিভিন্ন মিডিয়ার ভাইরালে অতি দ্রুত নায়ক-প্রেমিক-রাজনীতিবিদ বনে গেছেন।এখন তাকে সব বিশেষণে বিশেষায়িত করা চলে। কী আশ্চর্য শক্তি এই ভাইরালের।


এর পরের কথায় আসি।দেশে ঘটে যাওয়া কিছু বিছিন্ন ঘটনাও ভাইরাল হচ্ছে। তা জনগণকে সচেতন করতে বেশ কাজে লাগছে। খুন, ধর্ষণ, হত্যা ,নির্যাতন, সড়ক দুর্ঘটনা,পাচার, ঘুষ লেনদেন, ইত্যাদি ঘটনাও মিডিয়াতে ভাইরাল হচ্ছে।এর মধ্যেই ভাইরাল হলো রিফাত হত্যার নানা ভিডিও, ছেলে ধরার ভিডিও, মা রেণুকে পিটিয়ে হত্যার ভিডিও, প্রিয়া সাহার বক্তব্য, ব্যারিস্টার সুমন ইত্যাদির নানা ভিডিও।কিন্তু আসলে কাজটা কি হলো? কাজের কাজ কিছুই হলো না আসলে। এভাবে ভাইরাল জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েছি আমরা সবাই। সমস্যার সমাধান না খুঁজে ভাইরাল নিয়ে ব্যস্ত। যে লোকগুলো রেণুকে পেটানোর ভিডিও করছিল তারাও যদি এগিয়ে যেত, তাহলে তাকে হয়তো মরতে হতো না।
ঢাকা শহরে এমনকি সারাদেশে বর্তমানে একটি সমস্যা হলো ডেঙ্গু। প্রতিদিন ষোল থেকে সতের’শ রোগী ভর্তি হচ্ছে হাসপাতালে। ইতোমধ্যে মারা গেছে এক’শ এর বেশি। কী ভয়ংকর মহামারী রুপ নিয়েছে। ছেলেকে কবরে শুইয়ে আবার মেয়ের হাসপাতালের বিছানায় বাবা-মা। কী মর্মস্পর্শী ঘটনা। কিন্তু এসব বিষয় নিয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা না নিয়ে বিভিন্ন নেতাকর্মী ও সুধীসমাজ ভাইরাল হওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত। তারা ঝাটা হাতে পরিষ্কার রাস্তায় নেমে ডেঙ্গু প্রতিরোধের অভিনয় করছে। প্রথম সারির নেতারা খোলা জায়গায় জনসভা করে ঔষধ স্প্রে করে মহড়া উৎসব পালন করছে।কেউ মশারী দিয়ে দেহ ঢেকে বাইক নিয়ে ভাইরাল হয়েছে। কোন কোন নেতাকর্মী স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে সমাবেশ পদযাত্রা করছে। আর টেলিভিশন খবরে পত্রিকাতে নিউজ হচ্ছে: ‘বাড়ছে আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা, ডেঙ্গু নিধনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে কোটি কোটি টাকার অকার্যকর ঔষধ।’কী দেশে আমাদের বসবাস!


তাই এখন মনে হচ্ছে ডেঙ্গুর চেয়ে ভাইরাল জ্বর প্রকট আকার ধারণ করেছে। এই ভাইরাস জ্বর থেকে মানুষকে রক্ষা করতে না পারলে জাতি আরো সংকটময় অবস্থায় নিপতিত হবে এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।রাতারাতি হিট বা খ্যাতি লাভের বাসনা থেকে নিঃস্কৃতি না পেলে, এই লোভ মানুষকে কোথায় নিয়ে যাবে তার ইয়ত্যা নেই। মেধাবী লোক বঞ্চিত হবে তাদের প্রাপ্যতা থেকে আর এর অন্তরালে কিছু গোব-গোনেশ ভাইরাল হয়ে অধিকার করবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গা। ফলে যা হবার তাই হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here